Топ-100
Back

ⓘ ফেনী সরকারি কলেজ




                                     

ⓘ ফেনী সরকারি কলেজ

ফেনী সরকারী কলেজ বাংলাদেশের ফেনী জেলার একটি ঐতিহ্যবাহী উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। দক্ষিণ-পূর্ব বাংলার অন্যতম প্রাচীন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এটি। এটি ফেনী শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত।

                                     

1. প্রতিষ্ঠার পটভূমি

১৯১৮ সালের দিকেই কলেজটি প্রতিষ্ঠার জন্য বিভিন্ন উদ্যোগ হাতে নেওয়া হয়। ১৯২২ সালে খান বাহাদুর বজলুল হক একটি ট্রাস্টি বোর্ড গঠন করেন এবং তখন থেকেই মূলত কলেজটির যাত্রা শুরু হয়। কলেজের জন্মলগ্নে প্রথম গভর্নিংবডির সদস্য ছিলেন মরহুম খান বাহাদুর আবদুল আজিজ, মরহুম খান সাহেব মৌলভী বজলুল হক, মরহুম মৌলভী আব্দুল খালেক, মরহুম মৌলভী হাছান আলী, মরহুম মৌলভী আবদুস ছাত্তার, সর্বপ্রয়াত শ্রীরমণী মোহন গোস্বামী, মহেন্দ্র কুমার ঘোষ, কালীচরণ নাথ, শ্রীগুরু দাস কর, শ্রীকালিজয় চক্রবর্তী, এনায়েত হাজারী, কলেজ প্রতিষ্ঠানকালীন অধ্যক্ষ বীরেন্দ্র ভট্টাচার্য এবং তৎপরবর্তী অধ্যক্ষ অম্বিকাচরণ রক্ষিত রায়বাহাদুর প্রমুখ। কমিটির প্রথম সভাপতি ছিলেন ফেনীর তখনকার মহকুমা প্রশাসক জনাব আকরামুজ্জামান খান এবং প্রথম সেক্রেটারি ছিলেন মরহুম মৌলভী আব্দুল খালেক।

                                     

1.1. প্রতিষ্ঠার পটভূমি অর্থ ও জমি সংগ্রহ

ফেনী অঞ্চলের জনগণের টাকায় ফেনী কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। সে সময় প্রথম ধাপে স্থানীয়ভাবে ২০হাজার টাকা চাঁদা উঠেছিল। পরে নোয়াখালী জেলা বোর্ড দেয় ৫০হাজার টাকা, কলিকাতা নিবাসী ফেনীর আমিরগাঁওর জমিদার চন্দ্রীচরণ সাহা দেন ৪হাজার টাকা, নোয়াখালীর জমিদার কুমার অরুণ চন্দ্র সিংহ বাহাদুর দেন ২ হাজার টাকা, সত্যেন্দ্র চন্দ্র ঘোষ ১ হাজার টাকা, লক্ষীপুরের সাহেস্তা নগরের জমিদার প্যারীলাল রায় চৌধুরী দেন পাঁচশত টাকা, ফেনীর বাঁশপাড়ার জমিদার পরিবারের চন্দ্র কুমার চৌধুরী দেন ১ হাজার টাকা। ফেনীর পুরনো হাজারী বাড়ী কিছু জমি ও অর্থ দান করেন। কলেজ প্রতিষ্ঠা-লগ্নে কোলকাতা ও রেঙ্গুন প্রবাসী এ অঞ্চলের কর্মজীবী মানুষেরা কলেজ স্থাপনের জন্য উদারহস্তে বিপুল অর্থ সাহায্য করেছিলেন। ফেনী হাই স্কুলের বার্ষিক ১ টাকা ৪ আনা খাজনামূলে দান করা জমিতে বর্তমান যেখানে মূল ভবন অবস্থিত কলেজের কার্যক্রম শুরু হয়। পরে আশেপাশের কিছু খাসজমি ও ব্যক্তিমালিকীয় জমি দান ও ক্রয় সূত্রে কলেজের অন্তর্ভুক্ত হয়। বর্তমান কলেজের আয়তন ৯.২৫ একর ফেনী মৌজায় ৬.৫ একর, ফলেশ্বর মৌজায় ৩ একর। একটি কলেজ গৃহ, পুকুরের দুপাশে একটি হিন্দু ও একটি মুসলিম হোস্টেল নিয়ে কলেজের যাত্রা। প্রতিষ্ঠাপর থেকেই সকলের সার্বিক সহযোগিতায় ও ছাত্র বেতনে আর্থিক সমস্যা থেকে মুক্ত থাকে কলেজটি। ১৯২৬ সালের ১০ আগস্ট তদানিন্তন ব্রিটিশ ভারতের মহামান্য গভর্নর স্যার হিউ ল্যান্সডাউন স্টিফেনশন কে সি আই, এস আই সি এস কলেজের মূল ভবনের দোতলা উদ্ভোধন করেন।

                                     

1.2. প্রতিষ্ঠার পটভূমি প্রতিষ্ঠা পরবর্তী পটভূমি

কলেজটি যখন প্রতিষ্ঠিত হয়, তখন বৃহত্তর নোয়াখালীতে ফেনী, নোয়াখালী ও লক্ষ্মীপুর জেলা এটিই ছিল উচ্চশিক্ষার একমাত্র প্রতিষ্ঠান। সারা ভূ-ভারত জুড়ে অসহযোগ আন্দোলন, খেলাফত ও স্বরাজ আন্দোলন এবং বিশ্বযুদ্ধোত্তর অস্থিতিকর পরিস্থিতিরর মধ্যেও উদ্যোক্তাগণ ফেনীতে একটি উচ্চশিক্ষা বিদ্যাপীঠ স্থাপনের প্রচেষ্টায় তাদের ব্রত থেকে সাফল্য অর্জন করায় ১৯৩৭ সালের ক্যালকাটা গ্যাজেট এ প্রকাশিত হয়েছিল,

Their efforts were crowned with success even at a time when non-co-operation movement was in fullest swing.

১৯৩৯ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে ব্রিটিশ সৈন্যরা ফেনী কলেজে অবস্থান নেয়। এ সময় ফেনী কলেজ ভবন যুদ্ধকালীন মিত্রবাহিনীর সামরিক হাসপাতাল হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ায় কলেজের কার্যক্রম অস্থায়ীভিত্তিতে ব্রাহ্মণবাড়িয়াতে ফেনী কলেজ নামে স্থানান্তরিত হয় এবং যুদ্ধ শেষে কলেজটি আবার স্ব-স্থানে ফিরে আসে। পরপবর্তীতে সেখানে ওই অবকাঠামোর ওপরই ব্রাহ্মণবাড়িয়া কলেজ প্রতিষ্ঠা করা হয়। ১৯৭৯ সালের ৭ মে কলেজটি জাতীয়করণ করা হয়।



                                     

2. শিক্ষা কার্যক্রম

প্রাচ্যের অক্সফোর্ড খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ১৯২১ সালে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার মাত্র এক বছর পর ১৯২২সালে ফেনী কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয় এবং একই বছরের ৮আগস্ট বাংলা, ইংরেজি, আরবি, ফারসি, সংস্কৃত, গণিত, ইতিহাস ও যুক্তিবিদ্যা বিষয়ে ১৪৬ জন শিক্ষার্থী নিয়ে আই.এ ক্লাস চালু হয়। যার মধ্যে ৭১জন ছিল মুসলিম। শুরু থেকেই উন্নয়নের লক্ষ্যে দৃঢ়নিষ্ঠ অগ্রগতি অর্জিত হওয়ায় সরকার ও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ মাত্র দুবছরের মধ্যেই ১৯২৪ সালে কলেজটিকে প্রথম শ্রেণির মর্যাদায় উন্নীত করে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে আরবি ও ইতিহাস বিষয়ে অনার্সসহ ডিগ্রী পর্যায়ে বি.এ কোর্সে পাঠদান অনুমোদন করে। কলেজটিতে আই.কম কোর্স চালু হয় ১৯৪১ সালে; আই.এস.সি কোর্স চালু হয় ১৯৪৭ সালে; বি.কম কোর্স চালু হয় ১৯৬২ সালে; বি.এস.সি কোর্স চালু হয় ১৯৬৪ সালে। নব পর্যায়ে অনার্স কোর্স প্রবর্তিত হয় ১৯৯৭ সালে। প্রথম পর্যায়ে বাংলা, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, অর্থনীতি, গণিত, সমাজকর্ম, ব্যবস্থাপনা ও হিসাববিজ্ঞান চালু হয়। ২০১০-১১ শিক্ষাবর্ষে ইসলামের ইতিহাস ও রসায়ন বিষয়ে এবং ২০১১-১২ শিক্ষাবর্ষে ইংরেজি ও প্রাণিবিদ্যা বিষয়ে অনার্স চালু হয়। ২০১২-১৩ শিক্ষাবর্ষে পদার্থবিদ্যা, উদ্ভিদবিদ্যা ও ইতিহাস বিষয়ে এবং ২০১৩-১৪ শিক্ষাবর্ষে দর্শন বিষয়ে অনার্স কোর্স চালু হয়। বর্তমানে ফেনী সরকারী কলেজে কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে উচ্চ মাধ্যমিক শাখা এবং জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে অনার্স, ডিগ্ৰী ও মাস্টার্স কোর্সে শিক্ষা কার্যক্ৰম পরিচালিত হয়। এই কলেজে বর্তমানে অধ্যয়নরত ছাত্র-ছাত্রীর সংখ্যা প্রায় ২২ হাজার। বর্তমানে ১৫টি বিষয়ে অনার্স কোর্স, ১০টি বিষয়ে মাস্টার্স ১ম পর্ব প্রিলিমিনারি ও ৭টি বিষয়ে মাস্টার্স শেষ পর্ব কোর্স চালু রয়েছে।

                                     

2.1. শিক্ষা কার্যক্রম উচ্চ মাধ্যমিক

ফেনী কলেজে এইচএসসি বা উচ্চ মাধ্যমিক শ্ৰেণীতে বিজ্ঞান, মানবিক ও ব্যবসায় শিক্ষা শাখায় পাঠদান করা হয়। প্ৰতিটি শাখায় ৪৫০টি করে সর্বমোট ১৩৫০টি আসন রয়েছে।

                                     

2.2. শিক্ষা কার্যক্রম স্নাতক পাস

পাস কোর্স সমূহ হচ্ছেঃ

  • বি.এস.এস পাস
  • বি.বি.এস পাস
  • বি.এ পাস
  • বি.এস-সি পাস
                                     

2.3. শিক্ষা কার্যক্রম স্নাতকোত্তর

ফেনী কলেজে ১৫টি বিষয়ে স্নাতকোত্তর শেষ পর্ব বা মাস্টার্স শেষ পর্ব কোর্স রয়েছেঃ

২০১০-১১ থেকে

  • রাষ্ট্ৰবিজ্ঞান
  • হিসাববিজ্ঞান
  • বাংলা
  • ব্যবস্থাপনা

২০১১-১২ থেকে

  • গণিত
  • উদ্ভিদবিজ্ঞান
  • ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি
  • প্রাণিবিদ্যা
  • ইতিহাস
  • রসায়ন
  • সমাজকর্ম
  • অর্থনীতি
  • ইংরেজি
  • পদার্থবিদ্যা
                                     

3. অবকাঠামো

ফেনী সরকারি কলেজ ১৯২২সালে প্ৰতিষ্ঠিত হলেও কলেজটি এখনও অনুন্নত। কলেজে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ব্যবস্থা নেই। যার মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হল শ্রেণী কক্ষের স্বল্পতা। ফেনী কলেজের প্রধান ভবনটিকে ফেনী গণপূর্ত বিভাগ দশ বছর আগে ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করলেও ভবনটি এখনও ব্যবহৃত হচ্ছে।

কলেজে আরো যে সকল ভবনাদি রয়েছে তাহল- বিভাগীয় কার্যালয়সহ একাডেমিক ভবন, কলা ভবন ১টি, বিজ্ঞান ভবন ২টি, বাণিজ্য ভবন ১টি, অনার্স ভবন ১টি, নির্মাণাধীন একাডেমিক ও পরীক্ষা ভবন ১টি, মসজিদ ১টি, খেলার মাঠ ১টি, অডিটোরিয়াম ১টি, বোটানিক্যাল গার্ডেন একটি, অম্বিকাচরণ রক্ষিত রায় বাহাদুর উদ্যান ১টি, ক্যান্টিন ১টি এলিন কৃষ্ণচূড়া, ছাত্রাবাস ১টি, ছাত্রীনিবাস ১টি নির্মাণাধীন, পুরাতন ছাত্রাবাস ২টি । শহীদ মিনার ১টি, বধ্যভূমি স্মৃতিফলক ১টি, বৈদ্যুতিক সাব স্টেশন ১টি, কম্পিউটার ল্যাব ১টি, প্রতিটি বিভাগে ১টি করে মোট ১৫টি সেমিনার লাইব্রেরি ও ১টি কেন্দ্রীয় লাইব্রেরি, অধ্যক্ষের বাসভবন ১টি ব্যবহার অযোগ্য। ছাত্রছাত্রীর তুলনায় শ্রেণি কক্ষ কম হওয়ায় শ্রেণি কার্যক্রম পরিচালনা করতে প্রতিনিয়ত হিমশিম খেতে হচ্ছে। বর্তমানে শ্রেণি কক্ষের স্বল্পতার কারণে উচ্চ মাধ্যমিক ও অনার্স ক্লাস সমূহ ১ম শিফট ৯:০০-১২:৪৫ ও স্নাতক পাস, মাস্টার্স ও প্রিলিমিনারির ক্লাস সমূহ ২য় শিফট ১:৩০-৪:৩০ এ অনুষ্ঠিত হচ্ছে।



                                     

3.1. অবকাঠামো ছাত্রাবাস

কলেজ ছাত্রাবাসটি কলেজ ক্যাম্পাস থেকে প্রায় দুই কিঃমিঃ দূরে শহরের হাসপাতাল মোড়ে অবস্থিত।

                                     

3.2. অবকাঠামো ছাত্রীনিবাস

ফেনী সরকারি কলেজের ছাত্রীনিবাসটি বর্তমানে নির্মাণাধীন রয়েছে।

                                     

4. কলেজের ফলাফল

২০১২ সালে এইচ.এসসিতে গড় পাশের হার ছিল ৮২.৩১% এবং জি.পি.এ-৫ পেয়েছে ১০৭ জন । তাছাড়া কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডে মেধাতালিকায় ১১তম স্থান লাভ করে। ২০১৩ সালে এইচ.এসসি তে গড় পাশের হার ছিল ৮৩.৪৭% এবং জি.পি.এ-৫ পেয়েছে ১৩২ জন যা কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডে মেধা তালিকায় ৬ষ্ঠ স্থান লাভ করে।

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় তার অধিভুক্ত অনার্স ও মাস্টার্স পর্যায়ের কলেজগুলোর ৩১টি সূচকের ভিত্তিতে ২০১৫ সালের র‌্যাংকিং প্রকাশ করে। উক্ত র‍্যাংকিংয়ে চট্টগ্রাম অঞ্চলের কলেজগুলোর মধ্যে ফেনী সরকারী কলেজ ৩য় স্থান অর্জন করে।

                                     

5. ফেনী কলেজ বধ্যভূমি

১৯৭১ সালের এপ্রিল মাসে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী বিমান হামলা চালিয়ে ফেনীকে তাদের দখলে নিয়ে প্রথমেই ফেনী কলেজ ও পলিটেকনিকেল ইনষ্টিটিউট সহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোতে অবস্থান নেয়। ফেনী কলেজের এই স্থানটিতে তখন ছিল ফুটবল খেলার গোলবার। ফেনীতে হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রথম প্রতিরোধ গড়ে তোলে ফেনী কলেজের ছাত্র ও শিক্ষকরা। সেই প্রতিহিংসায় হানাদার বাহিনী কলেজ ক্যাম্পাসের এই স্থানটিকে তাদের টর্চার সেল বানিয়ে গন মানুষকে হত্যা করে মাটি চাপা দেয়। সেখানে নিরীহ মানুষকে ঝুলিয়ে নির্মমভাবে নির্যাতন চালিয়ে হত্যা কৱা হতো। ফেনী কলেজে হানাদার বাহিনীর হত্যাযজ্ঞের হাত থেকে রেহাই পাননি এ কলেজের বিজ্ঞানের শিক্ষক ফজলুল হক। এই বধ্যভূমির উপর দাঁড়িয়ে আছে ফেনী কলেজের অনার্স ভবন! ভবনটির পেছনের অংশে সারি সারি লাশ যেখানে মাটিচাপা দেওয়া হয়েছিল সেখানে নির্মাণ করা হয়েছে সেফটি ট্যাংক। স্থানটিকে সংরক্ষণ না করে ক্যাম্পাসের অন্যত্র করা হয়েছে মুক্তিযুদ্ধ বধ্যভূমি স্মৃতি স্তম্ভ।